দৈনিক ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে ৭ দিন সর্বশেষ সংবাদ নিয়ে

মাদারীপুর ২৪ ডটকম

Ruposhi Online

বিধবার ৪০ বছরের আশ্রয়স্থল ভেঙ্গে দিলো জেলা প্রশাসন: মানবতার চরম লঙ্ঘন

সংশ্লিষ্ট বিভাগ: গুরুত্বপূর্ণ খবর,প্রধান সংবাদ,সব সংবাদ |

জহিরুল ইসলাম খান: ৪০ বছর আগে নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো আলেয়া বেগম তার স্বামী হারুন-অর-রশিদকে নিয়ে মাদারীপুরের দরগাহখোলা এলাকায় জলা-জঙ্গলে পূর্ণ একটি এলাকায় ছোট একটি ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছিলেন। বর্তমানে তিনি সত্তরোর্ধ বয়সী। পরিত্যক্ত হিন্দু সম্পত্তি থেকে সেই জায়গা সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত হয়। গত প্রায় দুই যুগ ধরে আলেয়া বেগম সরকারি অফিসে অনেক আবেদন নিবেদন করে তার নিজের নামে লিজ পাননি। এরই মধ্যে ৬ বছর আগে স্বামী মারা যান। তবে এই জমি তার বদলে লিজ দেয়া হয়েছে পাশের অর্থবান এক ব্যক্তিকে যার একটি দোতলা বিল্ডিং আছে। সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শ্রমিকদের নিয়ে গিয়ে সেই ঘরটি ভেঙ্গে মাটির সাথে গুড়িয়ে দেন। এ সময় বিধবার আর্তিতে চারিদিক ভারি হয়ে ওঠে। তিনি চিৎকার বলে বলতে থাকেন, সৃষ্টিকর্তা যেন এর বিচার করেন। তিনি বৃষ্টি-বাদলের দিনে কোথায় গিয়ে থাকবেন!
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চল্লিশ বছর ধরে যে ঘরে সন্তানাদি নিয়ে বসবাস সেই ঘর উচ্ছেদের সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বিলাপ করছিলেন সত্তরোর্ধ বিধবা আলেয়া বেগম। মাদারীপুর শহরের দরগাহখোলা এলাকায় তার বসতঘরটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলেও ঘর ছাড়তে নারাজ তিনি। বিলাপ করছেন আর চিৎকার করে বলছেন, ‘নদী ভাঙা মানুষ আমি, ৪০ বছর আগে এখানে স্বামীকে নিয়ে ঘর তুলেছি। তখন ছিল জঙ্গল আর জঙ্গল পূর্ণ। আমি যখন ঘর উঠাউ তখন এখানে শেয়াল-ঘাটাশে ডাকতো, আমার ছেলে-মেয়েদের তখন ছেলে-মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কইতাম বাবা ভয় পেও না। আমি আছি। আজ সবার বড় বড় বিল্ডিং। আমি এই ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না, মরে গেলেও যাব না। আমার ঘর যে ভাঙ্গাইছে আল্লাহ তার বিচার করো।’ আলেয়া বেগমের কান্না দেখে স্থানীয় লোকজনের অনেকে কাঁদতে শুরু করেন। এমনকি উপস্থিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনের চোখও অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘মাদারীপুর শহরের ১১২নং চরমদন রায় মৌজার ১নং খাস খতিয়ানের ১৭৫নং দাগে প্রায় ৬ শতক জমির উপর প্রায় ৪০ বছর আগে একটি টিনের ঘর তুলে বসবাস করে আসছিলেন ভূমিহীন বাসিন্দা বিধবা আলেয়া বেগম। বিআরএস মাঠপর্চা ও কালিপর্চাতেও তার টিনের ঘরের কথা উল্লেখ আছে। তার নামে বিদ্যুতের মিটার এবং পৌরসভার হোল্ডিং নম্বর ও পানির লাইনও চলমান।
পাশের প্রভাবশালী মতিন তালুকদার ওই বিধবাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য আদালতে কয়েক দফা মামলা করে দখল নিতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে জেলা প্রশাসনের অর্পিত সম্পত্তি শাখার শরণাপন্ন হন। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৩ জুলাই অর্পিত সম্পত্তি অফিসের পক্ষ থেকে সত্তরোর্ধ এই বৃদ্ধা বিধবাকে আদেশ করা হয়েছে যে, তিনি যেন ৩ দিনের মধ্যে তার স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে যান।
এদিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানজিলা কবির ত্রপা সদর থানা পুলিশ, বিদ্যুৎকর্মী ও শ্রমিক নিয়ে ওই ঘরটি ভেঙ্গে উচ্ছেদ করে দেন। তবে স্থানীয়দের দাবী, মতিন তালুকদারের জমি আছে, আছে পাকা বাড়ি। তিনি কি খাস সম্পত্তি লিজ পাওয়ার অধিকার রাখেন। ৪০ বছর দখলে থাকা ভূমিহীন বিধবা লিজ পাবেন না কেন।
আলেয়া বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন জানান, গত দুই যুগ বছর ধরে জেলা প্রশাসনের এই খাস জমির আবেদন করে অসংখ্যবার দৌড়েছেন। এই সুযোগে জেলা প্রশাসনের ভিপি শাখায় কর্মরত অনেক টাকাও নিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ভিপি শাখায় কর্মরত দুই জন মিজানকেই টাকা দিয়েছেন। তাদের বেশ কয়েকবার এই এলাকায় তদন্তে আসে। তবে এই জমি তাকে না দিয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পাশের এক প্রভাবশালী মতিন তালুকদারের নামে এক ব্যক্তিকে। তার নিজস্ব জমিতে দোতলা একটি পাকা ভবন রয়েছে।
আলেয়া বেগমের ছেলে নূরে আলম বলেন, আমার বাবার একটি মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ছিল। কিন্তু তালিকাভূক্ত না হওয়ায় আমরা কোন সহযোগিতা পাইনি। আর আমাদের পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থল ঘরটিও ভেঙ্গে দিল প্রশাসন। দেশে গরীবের জন্য কোন বিচার নাই।’
মাদারীপুরের মানবাধিকার কর্মী মাসুম হাওলাদার বলেন, সরকারি ৯৬ শতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ জমি মতিন তালুকদার নামের একজনকে দেয়া হলেও সরকারি ওই জমির এক প্রান্তে একটি ঘরে থাকা ওই ঘরটি না ভাঙ্গতে অনুরোধ করেন এলাকাবাসী। তবে বিষয়টি কোন আমলেই নেননি উচ্ছেদ অভিযানে যাওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। মানববতার চরম লঙ্ঘন দেখে বিষ্মিত এলাকার সচেতন মানুষ।উচ্ছেদ অভিযানে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানজিলা কবির ত্রপা জানান, আমি জেলা প্রশাসক স্যারের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে উচ্ছেদে এসেছি। আমি আইন-অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। কারো যদি কিছু বলার থাকে তবে জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে গিয়ে বলতে পারেন।
এদিকে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায় যে, জেলা প্রশাসক কামালউদ্দিন বিশ্বাস ঢাকায় জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে রোববারই ঢাকায় গেছেন।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বাবর আলী মীর বলেন, সরকারি জায়গায় ঘর থাকে তা অবশ্যই আইন অনুযায়ী ভেঙ্গে উচ্ছেদ করে দিতে হবে। তবে ওই বিধবা নারী আবেদন করেছেন কিনা আমি জানি না। তিনি আবেদন করলে অব্যশই তিনি বরাদ্দ পেতেন। হয়তো আগের কোন জেলা প্রশাসক ওই খাস জমি মতিন তালুকদারকে বরাদ্দ দিয়েছেন। তবে তার যদি সম্পদ থাকে তবে তিনি এই জায়গা পেতে পারেন না। সরকারি খাস জমি বরাদ্দ পাবেন ভূমিহীনরা।

QR Code - Take this post Mobile!
Use this unique QR (Quick Response) code with your smart device. The code will save the url of this webpage to the device for mobile sharing and storage.

One Response to বিধবার ৪০ বছরের আশ্রয়স্থল ভেঙ্গে দিলো জেলা প্রশাসন: মানবতার চরম লঙ্ঘন

  1. Very inhumanity. Please return her land as special consideration from district administration.

    Md. Abubakkar Siddique
    ২৯-০৭-২০১৬ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *