দৈনিক ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে ৭ দিন সর্বশেষ সংবাদ নিয়ে

মাদারীপুর ২৪ ডটকম

Ruposhi Online

মুক্তিসেনা : আলমগীর হোসাইন

সংশ্লিষ্ট বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন,মুক্তিযুদ্ধ,সব সংবাদ |

Muktisenaপ্রসঙ্গ কথা :
মাদারীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে যার নামটি অবশ্যই সামনে চলে আসে তিনি হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদারীপুর এরিয়াকে ৩টি এরিয়া কমান্ডে ভাগ করা হয়েছিল। মাদারীপুর সদর, কালকিনি ও রাজৈর থানা নিয়ে গঠিত ১নং এরিয়া কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন আলমগীর হোসাইন।
তৎকালীন পাকিস্তান বয়েজ এয়ার ফোর্স-এ যোগদান করেন এবং করাচীতে চাকুরীরত ছিলেন আলমগীর হোসাইন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ২১ মার্চ তিনি ছুটি নিয়ে করাচী থেকে বাড়িতে আসেন। তিনি বাড়িতে এসেই দেশ মাতৃকার টানে ২৮ মার্চ মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে ছাত্র যুবকদের যুদ্ধ কৌশল শেখানোর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগদান করেন। তিনি এ সময় স্বাধীনতার পক্ষে ছাত্র যুব সমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মহান এই মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রতি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইনের নিজের লেখা স্মৃতিচারণ, তাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাসের লেখা ও তার দেয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে এই প্রকাশনা। অনিচ্ছাকৃত কোন ধরণের ভুলত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ এবং তাকে নিয়ে যদি কারো কোন লেখা থাকে বা বই-ম্যাগাজিন বা স্মরণিকায় তার কোন লেখা সংগ্রহ থাকলে তা-ও প্রদানের জন্য অনুরোধ রইল। পরবর্তীতে বর্ধিত আকারে বা বই আকারে মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইনকে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে।

জহিরুল ইসলাম খান
সম্পাদক, দৈনিক বিশ্লেষণ
মোবা : ০১৭১৬৫৪১৭৪৪
ওয়েব: bisleson.com

প্রকাশকাল: ২৬ মার্চ, ২০১৩
প্রকাশনায়: দৈনিক বিশ্লেষণ
নতুন শহর, মাদারীপুর।
প্রচ্ছদ: জহিরুল ইসলাম খান।
কম্পোজ: তসলিম।
সহযোগিতায়: সুবল বিশ্বাস

————————————————————————————————————–

মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথা
আলমগীর হোসাইন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কাদেরীয়া বাহিনী ও হেমায়েত বাহিনী বাদে অন্য কোন স্বীকৃত বাহিনী ছিল না। মাদারীপুরের মুক্তিযুদ্ধ ২নং সেক্টরের অধীন পরিচালিত হলেও বৃহত্তর ফরিদপুর ছিল ৮নং সেক্টরের অধীন। তদানিনতন মাদারীপুর মহকুমা আগরতলা মামলা খ্যাত মুক্তিযুদ্ধের সফল সংগঠক কর্নেল (অব) শওকত আলী ও ষ্টুয়ার্ড মুজিবের কারণে ২নং সেক্টরের অধীন ছিল। কারণ ওনারা ২নং সেক্টরে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে কর্ণেল শওকত আলী বৃহত্তর মাদারীপুর অঞ্চলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ২নং সেক্টরের অধীন মাদারীপুর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাংগঠনিকভাবে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেন। ১নং এরিয়ায় ছিল মাদারীপুর সদর, রাজৈর ও কালকিনি। ২নং এরিয়ায় ছিল শিবচর, জাজিরা এবং ৩নং এরিয়া ছিল নড়িয়া, পালং. ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট নিয়ে গঠিত। এ ছাড়াও সুবেদার জয়নালের নেতৃত্বে একটি বিশেষ ফোর্স ছিল। ১নং এরিয়ার নেতৃত্বে ছিল মোঃ আলমগীর হোসাইন। তার অধীন মাদারীপুর থানার দায়িত্ব ছিল খলিলুর রহমান খান, কালকিনি আব্দুল মালেক, রাজৈর আব্দুল কাদের। ১নং এরিয়ার অধীন মাদারীপুর থানা কমান্ডার খলিল মুক্তিযুদ্ধে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে। তিনি ১নং এরিয়ার অপারেশন কমান্ডার হিসেবে মাদারীপুর অঞ্চলে অনেক সফল অভিযান চালান।
আমি বিমান বাহিনীতে চাকুরীরত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে করাচি থেকে ছুটিতে মাদারীপুর চলে আসি। যুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সরোয়ার মোল−া, শাজাহান খান, আব্দুল মোতালেব প্রমুখ ছাত্র-নেতাদের সমন্বয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে ছাত্র যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ শুরু করে। এ প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে।
আমাকে সহায়তা করেন খলিল খান এবং আর্মি আব্দুল হক। ২৭ এপ্রিল কর্নেল শওকত আলী ও স্টুয়ার্ড মুজিব মাদারীপুরে আসেন এবং সারা মহকুমার প্রতিটি থানা থেকে সংগৃহীত ছাত্র-যুবকদের মাঝ থেকে ১৬৪ জনের দলটিকে নির্বাচিত করেন। মাঠে শহরের ৩১ জনের একটি দল চৌকশ প্যারেড প্রদর্শন করে যার কমান্ড দিয়েছিলাম আমি। প্যারেড শেষে কর্নেল শওকত আলীর কাছে আমি রিপোর্ট করি। এ সময় খলিল কর্নেল সাহেবের কাছে আমাকে প্রথম দলে যেতে অনুরোধ করলে কর্নেল সাহেব এমন জোরে ধমক দেন যে মাঠের উপস্থিত সকলে কেঁপে উঠে। কারণ তার পরিকল্পনা ছিল আরো ছেলে সংগ্রহ করে আমি তাদের প্রশিক্ষণ দেই এবং পরে ভারতে যাই।
১৭ই এপ্রিল স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে প্রথম দল ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। দলটিকে ভারতে রেখে স্টুয়ার্ড মুজিব আবার দেশে চলে আসেন। ২০ দিন পর দলটি তেলেমুরা সেনাক্যাম্পে পৌছায়। এখানে এ দলের প্রায় ৩০ জন ট্রের্নিং কঠিন হওয়ায় দেশে ফেরত চলে আসে। বর্তমানে এদের অনেকে বড় মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেন।
প্রশিক্ষণ শেষে ২১ জনের প্রথম দলটি খলিল খানের নেতৃত্বে দেশে আসেন। যা এফ-২ নামে পরিচিত ছিল। এরা দেশের অভ্যন্তরে এসে চারভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং কথা থাকে সবাই নির্দিষ্ট একদিন কালিকাপুরে গামা মান্নানের বাড়িতে উপস্থিত হবে। কিন্তু ইতোমধ্যে কুলপদ্বীতে বাদল ও শাজাহান ধরা পড়লে সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। খলিল কারো সাথে যোগাযোগ করে সংগঠিত করতে না পেরে ভারতে ফিরে যায়। এ সময় তসলিম এসে লখন্ডায় মাঝিবাড়িতে এসে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং সবাইকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা নেয়। এর কয়েকদিন পরে এসে খলিল তসলিমের সাথে যোগ দেয়।
মাদারীপুুরে বোমা হামলা হওয়ার দিনই সন্ধ্যায় আমাদের কাছে থাকা সামান্য গোলাবারুদসহ একটি স্পীডবোটে উঠে আঙ্গারিয়ার দিকে রওয়ানা দেই। সেখানে শাজাহান খানসহ আমরা কয়েকদিন থাকার পরে স্টুয়ার্ড মুজিব ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হয়, তিনি আমাদের নিয়ে আগরতলা যান। সেখান থেকে শাজাহান খানকে শেখ মনি টেন্ডুয়া ও আমাকে ইলিয়াস চৌধুরী আসামে হাফলং মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং-এর জন্য পাঠান। ট্রেনিং শেষে আগরতলা এলে কর্নেল শওকত স্যার আমাকে শেখ মনির নির্দেশে মুজিব বাহিনী থেকে রিলিজ করিয়ে নেন। কর্নেল সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারি মাদারীপুরের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং কোন অপারেশণ হচ্ছে না বিধায় তিনি উদ্বিগ্ন। খলিলের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি আমার মাদারীপুর আসার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন এবং আমাকে ১নং এরিয়া কমান্ডারের নিয়োগ দিয়ে জেড ফোর্সের অধীনে এক্সক্লুসিভ গ্র“পকে ১নং এরিয়ার অধীন ন্যস্ত করেন। যার কমান্ডার ছিল মোহাম্মদ আলী এবং নড়িয়ার একটি ১৩০ জনের গ্র“পকে আমার নেতৃত্বে দেওয়া হয় যাদের আমি মাদারীপুর আসার পথে নড়িয়া রেখে আসি। আগরতলা থেকে আক্তার, কামাল কাজী, জাহাঙ্গীর, বাবুল আমার সাথে ছিল। আমার রওয়ানার সময় শেখ মনি এরিয়া কমান্ডার হিসেবে একটি রিভালবার প্রদান করেন।
আমি, ফজল খান, তসলিম ও হারুনকে নিয়ে একটি আদেশনামা জারি করে ক্যাম্পকে তিনভাগে ভাগ করি। যারা ১নং এরিয়া কমান্ডের অধীন থাকবে। ১নং ক্যাম্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় তসলিমকে, ২নং ক্যাম্পের দায়িত্ব হারুন শরীফ এবং ৩নং ক্যাম্প গোলাম মওলাকে এবং হেড কোয়ার্টারে আমি অবস্থান করি। অফিসের কাগজপত্র আনিস তৈরি করত এবং আমি তাতে স¡াক্ষর করতাম। এমনকি যুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধারা মিলিশিয়া ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমার কাছ থেকে সনদপত্র গ্রহণ করে। এ সনদপত্রে এরিয়া কমান্ডার হিসেবে আমি, মহকুমা কমান্ডার হিসেবে স্টুয়ার্ড মুজিব এবং সিভিল এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে আচমত আলী খান এমপি স্বাক্ষর করেছিলেন। এখানে সনদপত্র অন্য কারও পক্ষে সরকারীভাবে স্বাক্ষর দেয়ার সুযোগ ছিল না এবং দেনওনি।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বড় ও ছোট মুক্তিযোদ্ধা মাপার কোন যন্ত্র নেই। অনেকে বড় পদে থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করেনি। কিছু বর্ণচোরা মুক্তিযোদ্ধা কারও কাছ থেকে সুযোগ গ্রহণ করে মিথ্যা, বানোয়াট ইতিহাস রচনা করে কাউকে খুশী করার চেষ্টা করছেন। প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করছেন। সকল মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় থাকুক এই কামনা করি।
————————————————————————————————————–
সাক্ষাৎকার : মুক্তিযোদ্ধার দেখা মুক্তিযুদ্ধ
‘মাতৃভূমির প্রতি প্রেম সদা জাগ্রত থাকতে হবে’

আমার বয়স তখন ২৩ বছর। আমি তখন করাচিতে বিমানবাহিনীতে চাকরি করি। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দেশের অবস্থা ভাল ছিল না। ১৯৭১ সালের ২১ মার্চ আমি মাদারীপুরে ছুটে আসি। দেশে যুদ্ধ শুরুর পর আর সেখানে ফিরে যাই নি। যোগ দিলাম মুক্তিযুদ্ধে। প্রথম আমারা মাদারীপুরেই শারীরিক ট্রেনিং করি। আমার নেতৃত্বে ৩০০ থেকে ৫০০ জনের একটি ছাত্রদলের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এপ্রিল মাসে কর্নেল শওকত সাহেব এবং স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতেৃত্বে ১৬৫ জনের একটি দলকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। আমি তখন ভারতে যাইনি। আমি ও শাজাহান খান এমপি মাদারীপুরে বাঙালিদের যুদ্ধে প্রেরণের জন্য উৎসাহ দিতাম ও যাওয়ার ব্যবস্থা করতাম। আমাদের কাছে তখন অস্ত্র হিসেবে ষ্টেনগান ছিল।

একদিন জনতে পাড়লাম ফরিদপুর দিয়ে পাকবাহিনী মাদারীপুর আসবে। তাই আমি শাজাহান খান (নৌ-পরিবহন মন্ত্রী), হাবিব অদুদ, পরিমল স্পীডবোটে পালং থানায় যাই ওদের প্রতিহত করতে। সেখান থেকে আমরা কুমিল্লা দিয়ে ভারতে যাই। ভারতে যেতে আমাদের ৫ দিন লাগে। আমরা মুজিব বাহিনীতে যোগাদন করি। যেখানে আমরা একমাস প্রশিক্ষণ নেই। বিভিন্ন অস্ত্র সম্পর্কে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তা হলো এসএলআর, এসএমজি, টুইন্স হ্যান্ডগ্রেনেড, থার্টিসিক্স হ্যান্ডগ্রেনেড, ডিনামাইড, এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। মুজিব বাহিনীর ক্যাম্প ছিল আলাদা। আমার খাবার-দাবার ভাল পেতাম। খাবারের কোন কষ্ট করিনি। ক্যাম্পে ৩টি ব্যারাক ছিল, ২০০ জনের মত বাঙালি ছিল। একমাস পর আমাদের আসাম থেকে আগরতলা নিয়ে আসে। কর্নেল শওকত সাহেব আমাকে খুজে বের করে। আমার সাথে সে অনেক কথা বলে। আমাকে মেলাঘর ক্যাম্পে এনে তিনি আমাকে ২নং সেক্টরের অধীনে মাদারীপুরের ১নং এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেয়। আমি ১৭০ জনের প্রশিক্ষণ প্রাপ্তমুক্তির দল নিয়ে দেশে রওনা হই। তাদের মধ্যে ৪০ জন ছিল চালানোয় বিশেষজ্ঞ। তাদের লিডার ছিল মোহাম্মদ আলী। পালং থানায় আসলে ১২০ জন সেখানে থেকে যায়। আমি ৫০ জনের দল নিয়ে মাদারীপুর আসি। মাদারীপুরের মুক্তিবাহিনীর প্রথম ব্যাচের বাদল ও শাজাহান পাক হানাদারদের হাতে বন্দী হয়। এতে মুক্তির যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তছলিম আহমদ নেতৃত্বে আবার সবাই একত্রিত হয়। আমি তার সাথে যোগ দেই। আমাদের ক্যাম্প ছিল কালাগাছিয়া। সেখানে আমরা ৫টি বাড়িতে ক্যাম্পে স্থাপন করি। সেখানে আমরা একত্রে ৪০০ জনের মত মুক্তি থাকতাম। ক্যাম্পে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ভাল ছিল না। এলাকার লোকের সাহায্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। আমাদের ক্যাম্পে তখন অস্ত্র ছিল এলএমজি, এসএলআর, এসএল মাইনড, ডিনামাইনড ইত্যাদি। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার মত অস্ত্র ছিল না। ক্যাম্প পরিচালানা করার জন্য বিভিন্ন কাজে লোক নিযুক্ত করা হয়। আমি ছিলাম এরিয়া কমান্ডারের ১নং কমান্ডার। আমার অধীনে এরিয়া ডেপুটি কমান্ডার ছিল খলিল খান। ১নং ক্যাম্প কমান্ডার ছিল-হারুন-উর-রশিদ, ২নং তছলিম আহমেদ, ৩নং গোলাম মাওলা, মাদারীপুর সদর থানার দায়িত্ব ছিল খলিল খানের উপর। রাজৈর থানায় কমান্ডার ছিল কাদের মোল্লা, কালকিনি থানায় কমান্ডার ছিল মালেক। আমরা প্রথমে পাকবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করি। ওরা যাতে জনগণের থেকে কোন অর্থ আদায় না করতে পারে সে জন্য তহশিল অফিস সব আগুন দেই। আমরা কয়েকবার পাটগুদামে আগুন দেই। উদেশ্য ছিল আমাদের উৎপাদিত দ্রব্য দিয়ে যেন ওরা অস্ত্র ক্রয় না করতে পারে। কালকিনি থানা আক্রমণ করি। পাকবাহিনীর সাহায্যকারীদের আত্মসমর্পন করার আহক্ষান করি। তারা না ফিরে আসায় তাদের হত্যা করা হয়। সমাদ্দার ও ঘটকচরে রাজাকার বেশি ছিল। ডিসেম্বর মাসে জয়ের আভাস পাওয়া যায়। দিন দিন মুক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
৭ ডিসেম্বর আমি ও কয়েকজন নৌকায় করে শিবচর যাচ্ছিলাম। পথে মধ্যে শুনতে পেলাম সামনে পাকবাহিনী এ্যামবুশ করে আছে। তাই না এগিয়ে আমরা ফিরে আসি। এ.আর হাওলাদার জুট মিলে পাকবাহিনীর ক্যাম্প। ৮ ডিসেম্বর ক্যাম্প থেকে পাকবাহিনী ফরিদপুর যাইতে ছিল। আমরা তাদের আক্রমণ করি। শুরু হয় লড়াই। এ লড়াই ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। ওই দিন শহীদ হয় সরোয়ার হোসেন বাচ্চু। সন্ধ্যায় পাকবাহিনীর মেজর হামিদ খটক আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করে। আমরা জয় লাভ করি।
বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কার্যক্রম শুরু করায় আমি স্বাগত জানাই। ওদের বিচার না হলে মুক্তিযুদ্ধ অসম্পূর্ণ থাকবে। আমার একান্ত স্বপ্ন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় ইতিহাস বাস্তবিক হোক। ওদের কারণে পাকবাহিনী পেরেছে বাঙালির উপর অমানুষিক নির্যাতন করতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলে মুক্তির আশা পূর্ণ হবে।
বর্তমান প্রজন্ম জানে না মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। কিন্তু বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের যুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। এজন্য আমি পরিকল্পনা করেছি ডিসেম্বর মাসে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আসরে তাদের যুদ্ধের কাহিনী শোনাবো। তাদের ইতিহাস জানানোর দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের। এছাড়া নাটক-এর মাধ্যমে তাদের যুদ্ধের কাহিনী জানাবো। আমি মনে করি প্রত্যেকেরই মাতৃভূমির প্রতি প্রেম আছে। এই প্রেম সদা জাগ্রত থাকতে হবে। তারা দেশের জন্য নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে। সবাইকে দেশাত্মবোধক গান শোনার অনুরোধ করছি। দেশের প্রতি তাদের ভালবাসা থাকবে অকৃত্রিম।
(সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান। মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রকাশিতব্য গ্রন্থ থেকে নেয়া)
————————————————————————————————————–
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রসঙ্গ কথা
সুবল বিশ্বাস

মানুষের মনুষত্ববোধ, চিন্তা-চেতনা, মানবিক গুনাবলী, ত্যাগ-তিথিক্ষা, স্বাধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিশেষ গুণে গুণান্বিত মানুষগুলো যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন তাঁদের এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে। সমাজও দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে তাদের উপস্থিতি প্রত্যাশিত। আর এ প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি কখনই বিফল হবে পারে না। সমাজে যে যার অবস্থানে থেকে যতটুকু অবদান সমাজের জন্য রেখে যেতে পারেন সেটা নেহায়ের কম নয়। তবে কেউ কেউ নিরবে আমার কেউ কেউ প্রকাশ্যে তাদের অবদান রেখে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন দীর্ঘকাল। আবার এমন কেউ আছেন যিনি নিজেকে আড়াল করে রাখতে ভালবেসেছেন আবার অনেকে প্রচার বিমুখ হয়ে সমাজে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বনে ফুল ফুটলেও তার সুবাস লোকালয়ের মানুষকে বিমোহিত করে। এভাবেই মানুষ তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন চিরকাল।
আজ এমনি একজন প্রচার বিমুখ মানুষের কর্মকান্ড ও কর্মময় জীবনের নানা প্রসঙ্গ আলোকপাতের চেষ্টা করা হলো। তিনি হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইন ভাল মন্দের সংমিশ্রনের একজন মানুষ। কর্ম করে গেছেন নীরবে কিন্তু জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটুকু মিলাতে পারেননি। হয় তো এ জন্যই মৃত্যুর পরেও তিনি হয়ে গেছেন মানুষের জানার অন্তরালে। সর্বপরি তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার জীবনের জন্য আর কো বিশেষনের প্রয়োজন নেই। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সূর্য্য সন্তান। তাদের বিশেষনে তারা নিজেরাই গৌরবান্বিত এবং গর্বিত গোটা জাতি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইনের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মাদারীপুর শহরে সার্কিট হাউজ এর দক্ষিণ পার্শ্বের নিজ বাসভবনে। তার পিতা ছিলেন আব্দুল গফুর মিয়া তবে গফুর মাস্টার নামেই তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। মাতা আসিয়া বেগম ৭ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো। তবে ভাইদের মধ্যে বড়। তার বোনেরা হলেন মমতাজ খানম, মনোয়ারা বেগম, সাফিয়া আক্তার, ভাই আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. শাহ্ জাহান মিয়া ও মো. বাবর মিয়া। চার ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাই-ই মুক্তিযোদ্ধা। একারণে এ পরিবারটি গোটা মাদারীপুর বাসীর কাছে অত্যন্ত সম্মানের।
আলমগীর হোসাইন ১৯৬০ সালে মাদারীপুর সদর (লেকেরপাড়) প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণি পাস করে ইউনাইটেড ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬৬ সালে ঐ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন। তার পরের বছর ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বয়েজ এয়ার ফোর্স-এ যোগদান করেন এবং করাচীতে চলে যান। করাচীতে থাকাকালীন এ্যারোনোটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ২১ মার্চ তিনি ছুটি নিয়ে করাচী থেকে বাড়িতে আসেন। তিনি বাড়িতে এসেই দেশ মাতৃকার টানে ২৮ মার্চ মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে ছাত্র যুবকদের যুদ্ধ কৌশল শেখানোর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগদান করেন। তিনি এসময় স্বাধীনতার পক্ষে ছাত্র যুব সমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এর পর ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মাদারীপুর ১৬৪ জন ছাত্র যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিতে ভারত গমন করেন। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্টুয়ার্ড মুজিব। এই দলটি আগড়তলার উদ্দেশ্যে রওনা করার পর আলমগীর হোসাইন ও ক্যাপ্টেন শওকত আলীর সাথে ভারত গমন করেন। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মাদারীপুরে ফিরে আসেন। যুদ্ধকালীন সময়ে বৃহত্তর ফরিদপুর ৮নং সেক্টরের অধীনে থাকলেও মাদারীপুর অঞ্চল ছিল ২নং সেক্টরের অধীনে। কারণ ক্যাপ্টেন শওকত আলী ছিলেন ২নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার। এ সময় মাদারীপুর এরিয়াকে ৩টি এরিয়া কমান্ডে ভাগ করা হয়েছিল। মাদারীপুর সদর, কালকিনি ও রাজৈর থানা নিয়ে গঠিত ১নং এরিয়া কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন আলমগীর হোসাইন। তিনি জুন মাসে ভারত চলে যান এবং জুলাই মাসের মাঝা-মাঝি ভারত থেকে জেড ফোর্সের এক্সক্লুসিভ গ্র“পের একটি দল নিয়ে মাদারীপুর আসেন এবং সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা তসলিমের ক্যাম্পে উঠেন। এক্সক্লুসিভ গ্র“প মাদারীপুরে এসে প্রথমেই সমাদ্দার ব্রিজ উড়িয়ে দেন। জুলাই মাসের শেষের দিকে পাকবাহিনীর সালে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ শুরু হয়। এক সময় মুক্তিযোদ্ধারা সংবাদ পায় খলিলুর রহমান খান ভারতে অস্ত্র আনতে যাওয়ার পথে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন। এ সংবাদ শুনে আলমগীর হোসাইন এর প্রস্তাবে কলাগাছিয়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা তার নামে কুলখানি ও মিলাদ দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে এক নম্বর এরিয়া কমান্ডকে খলিলবাহিনীর নামকরণ করে। পরবর্তীতে খলিলুর রহমান খান স্বশরীরে ফিরে এলে সকলে বিস্মিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ১ নম্বর এরিয়া কমান্ডের কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭২ সালে আলমগীর হোসাইন প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে নাজিমউদ্দিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি পুনরায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদানের জন্য গিয়েও যোগদান না করে ফিরে আসেন। চাকুরী নেন এ.আর হাওলাদার জুট মিলের ইঞ্জিনিয়ার পদে।
আলমগীর হোসাইন জীবদ্দশায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবং দীর্ঘকাল মাদারীপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ইউনিট কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি মাদারীপুর জেরা ক্রীড়া সংস্থার দীর্ঘ ১২ বছর সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন। এবং ১ বছর সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন মাদারীপুর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, হ্যান্ডবল ট্রেনিং সেন্টারের সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী মাদারীপুর জেলা সংসদের উপদেষ্টা এবং মাদারীপুর চেম্বার-অব-কমার্সের পরিচালক ছিলেন। এছাড়াও তিনি আওয়ামীলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।
২০১২ সালের ২৬ মে বেলা ১ টায় ঢাকা বারডেম হাসপাতালে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইন ইন্তেকাল করেন। তিনি তার আগের দিন অর্থাৎ ২৫ মে সন্ধ্যায় মাদারীপুর লেকেরপাড়ে সান্ধ্যকালীন ভ্রমণের সময় হৃদরোগে আক্রন্ত হন। ঐ সময় মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সামসুল হক তোতা তাকে দ্রুত নিরাময় হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা হৃদরোগ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান। ঐদিন রাতে তার মরদেহ মাদারীপুরে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সহকারে ২৭ মে মাদারীপুর পৌর ঈদগাহ্ ময়দানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য এ.আর. হাওলাদার জুট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান কাওসার হাওলাদার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসাইন এর কবরের জন্য মিল মাঠের অভ্যন্তরে মসজিদের পাশে বিশেষ স্থান বরাদ্দ দেন।
(লেখক: সুবল বিশ্বাস, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক)

————————————————————————————————————–
খেলা নিয়ে পাঁচালী
আলমগীর হোসাইন

আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি, তখন পুলিশ মাঠে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্ট ক্রীড়া অনুষ্ঠানে অংক দৌড়ে প্রথম হই। আমি সবসময় অংকে ভাল ছিলাম, তবে প্রথম হওয়ার মত ভাল ছিলাম না। অংক দৌড় হল, অংক মিলিয়ে দৌড় দিয়ে প্রথম হওয়া। বিষয়টি আমার জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। কিন্তু সেটিই ঘটল। কেমন করে যেন প্রথম হয়ে গেলাম। আমার সেকি উল্লাস, বন্ধুরাও আমার সাথে উল্লাসিত। অবশ্য যে কোন বিষয়ে প্রথম হওয়া বা পুরস্কার পাওয়া উল্লাসেরই ব্যাপার। আমি তার ব্যতিক্রম নই। অবশ্য জীবনের কোন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া একটা অন্যরকম অনুভূতি।

আমি ইউনাইটেড স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তখন স্কুলের বার্ষিক মিলাদে পায়েশ এবং জর্দা খাওয়ানো হতো। আর পায়েশ পাক করার জন্য দুধ সংগ্রহ করা হতো। দুধওয়ালারা স্কুলে এসে দুধ মেপে দিয়ে যেত। আর তখন দুধ মাপা হতো সের এবং ছটাকে। এই দুধ মাপা ও পুরো মিলাদের দায়িত্ব ছিল কালা হাকিম স্যারের উপর। তিনি আমাকে দেখে বললেন, এই তুই নাকি অংক দৌড়ে প্রথম হয়েছিস। পারিসতো এই দুধ মাপার হিসাব মিলা? সেটা ছিল একটা কঠিন কাজ। সের ছাঁকের হিসাব মিলানো ছিল কঠিন ব্যাপার।
হাকিম স্যার প্রায় সব খেলাতে অংশগ্রহণ করতেন। তখন ক্রিকেট খেলা ছিল আভিজাত্যপূর্ণ খেলা। পুলিশ মাঠে প্রায় সব খেলা-ধুলা হত। পুলিশ মাঠে ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সে সময় হাকিম স্যার ব্যাট করছিলেন। হঠাৎ এশটি বল এসে তার মাথায় লাগলো, তার কপাল ফেটে তিনি রক্তাক্ত হন। তখন ইউনাইটেড স্কুলে হেড মাস্টার ছিলেন হামিদ আকন্দ স্যার। তিনি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্তঃপ্রাণ ছিলেন। তখন আন্তঃস্কুল ফুটবল খেলা খুব জাকজমকভাবে হত। এ খেলায় হামিদ আকন্দ স্যারের কারনে ইউনাইটেড স্কুল খুব জোরে-সোরে অংশগ্রহণ করত। এই আন্তঃস্কুল ফুটবল খেলার এশটি খেলায় ইউনাইটেড স্কুলের সাথে চরমুগরিয়া মার্চেন্টস্ হাই স্কুলের খেলা অনুষ্ঠিত হয়। সে খেলায় এশটি দুঃখজনক ঘঁনা ঘটে। চরমুগরিয়া স্কুলের দুরন্ত খেলোয়াড় গফুর একটি বল নিয়ে ইউনাইটেড স্কুলের গোল মুখে আসে, বলটি এমন পর্যায় যে, গফুরের মাথায় বলটি লাগলে বা হেড করতে পারলে গোল হয়ে যাবে। কিন্তু ইউনাইটেড স্কুলের গোলরক্ষক বাদল সে সুযোগ দিতে চান নি গফুরকে। বাদল অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসে জাম্প করে গফুরের মাথার ওপর থেকে বলটি ধরে ফেলে। সে মুহূর্তে বাদলের হাটু গফুরের তলপেটে আঘাত করলে সে মাঠে পড়ে যায়। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাতে তিনি সুস্থ না হওয়ায় ভাল চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেওয়ার পথে লঞ্চে মারা যান। আন্তঃস্কুল ফুটবল এতটা জাকজমক হত যে, বিভিন্ন জায়গা থেকে খেলোয়াড়রা অংশগ্রহণ করত। হামিদ আকন্দ স্যার বিভিন্ন খেলোয়াড়দেরকে বিভিন্ন স্কুল থেকে এনে ইউনাইটেড স্কুলে ভর্তি করতেন, যাতে ইউনাইটেড স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। এয়াড়াও ইন্টারস্কুল খেলা হলেই শিবচরের জয়নাল যিনি পাটকাটা জয়নাল নামে পরিচিত ছিলেন এবং ধ্যানা ও পাগলা ইউনাইটেড স্কুলের পক্ষেই খেলতো। জয়নাল একজন তুখোড় এবং নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন। শরীফ বাড়ির তিন ভাই, মোয়াজ্জেম, কালু শরীফ ও মোনাসেফ শরীফ। তিনজনই পর্যায়ক্রমে তিন সময় তুখোড় গোলরক্ষক হিসেবে খেলেছেন। সৈয়দ সিরাজ ভাই গোলরক্ষক ছিলেন। সিরাজ ভাইয়ের গায়ের রং ফর্সা ছিল। তিনি সবসময় লাল জার্সি পড়ে খেলতেন। মজার ব্যাপার হলো, তার দল দুই গোল খেলেই সিরাজ ভাই আহতের ভান করে মাঠে পড়ে যেতেন। মু. মতিয়ার রহমান (বাদশা স্যার), তোতাদা (ডা. তোতা), মনিরুজ্জামান, খোকনদা, চুন্নুদা, মজিবরদা, বাচ্চু ভূইয়া, চরমুগরিয়ার লতিফ খাঁ এরা স্মরাণীয় ফুটবলার ছিলেন। স্বাধীনতাত্তোর সময় মজিবর, মোনাসেফ, হারুন, জাহাঙ্গীর, খলিল এরা ভাল ফুটবল খেলতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মজিবর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় ছিলেন। গিয়াসউদ্দিন নামে একজন খুবই দূরন্ত লেফট উইয়ং খেলোয়াড় ছিল। যাকে রকেট নামে সবাই চিনতো। যখন মাদারীপুরের ক্রীড়াঙ্গন স্থবির ছিল সে সময় কাওছার হাওলাদার এর উদ্যোগে ঢাকার বড় বড় ক্লাব সমন্বয়ে এ.আর. হাওলাদার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয় এবং মোঃ খালিদ হোসেন ইয়াদ মাদারীপুর জেলা দলের পক্ষে অনেক বিদেশী খেলোয়াড় এসে চমক সৃষ্টি করেন। ইয়াদ একজন ক্রীড়াবীদ ও সংগঠক বর্তমানে সে মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র।
একসময় মাদারীপুরে ব্যাডমিন্টন খেলা খুবই প্রসার ছিল। প্রত্যেক মহল্লায় ব্যাডমিন্টনের কোট ছিল এবং খেলা হতো। লুৎফর হাওলাদার, ডাঃ তোতা, মজিবর ভাই এরা খুবই ভাল ব্যাডমিন্টন খেলতেন। এরপরে মনিরুজ্জামান, পাগলা দা, মোয়াজ্জেম ভাই আরো পরে কবির, ইরান ভাল ব্যাডমিন্টন খেলতেন। ব্যাডমিন্টনে কবির দীর্ঘদিন চ্যাম্পিয়ন ছিল। কবির ফুটবলসহ প্রায় সব খেলাতেই দক্ষ, চ্যাম্পিয়ন এবং নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন। ব্যাডমিন্টন খেলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পর তষনকার এস.পি শফিকুর রহমান এর উদ্যোগে পুলিশ লাইনে ব্যাটমিন্টনের কোট নির্মাণ করা হয় এবং খুবই জাকজমকভাবে কয়েকটি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। মহকুমা থাকা অবস্থায় মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন। ডাঃ সিরাজুল হক তোতা। সে সময় স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়। এরপরে দোলন কাজী সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। আমি ১৯৮৭ সালে মাদারীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্ব গস্খহণ করি। আমার কমিটিতে বাবু ভাই, সিরাজ ভাই, কবির কাজী, মাসুদ, রেজা, সুরুজ, কবির, কালু খান, ইরান সবাই ছিল। আমরা নতুন আঙ্গিকে ক্রীড়াঙ্গনে কার্যক্রম শুরু করি। সবাই বলেন, ক্রীড়াঙ্গনে এশটি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হই। অনেকগুলো জাতীয় খেলা মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত হয়। এশটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের অনেককে ক্রীড়াঙ্গন ছেড়ে আসতে হয় এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গস্খহণ করেন প্রায়ত শহীদুজ্জামান খান রেজা। শুরু হয় ক্রীড়াঙ্গনের বন্ধত্যতা নির্বাসিত হয় ক্রীড়া কার্যক্রম। মামলা কোকদ্দমা অনেক অনিয়ম হয়ে স্টেডিয়ামের কার্যক্রম স্থগিত হয়। প্রায় বার/তের বছর স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে একটি বধ্যভূমি। এরই মধ্যে রজা মারা যায়। দীর্ঘদিন পর মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন কমিটি গঠিত হলে স্টেডিয়ামের প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। বর্তমানে ব্যাপক ক্রীড়া কার্যক্রম চলছে।
আমরা যখন স্টেডিয়াম থেকে চলে আসি এবং স্টেডিয়ামের কার্যক্রম যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এস.পি শফিকুর রহমানের উদ্যোগে হ্যান্ডবল ট্রেনিং সেন্টার গঠিত হয়। এই ট্রেনিং সেন্টারের উদ্যোগে মৃতপ্রায় ক্রীড়াঙ্গনকে সচল করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। ট্রেনিং সেন্টারের উদ্যোগে অনেক হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে মহিলা হ্যান্ডবল দলটি জেলার জন্য জাতীয় পর্যায়ের সম্মান এনে দেয়। মহিলা হ্যান্ডবল দল কয়েকবার জাতীয়ভাবে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ হওয়ার গেšরব অর্জন করে। হ্যান্ডবলে এ সাফল্যের পিছনে সকল কৃতিত্ব আমাদের স্থেহধন্য ত্রিনাথ দাসের। সে আমাদের গর্ব এবং ক্রীড়াঙ্গনের সম্পদ। তার উদ্যোগে বর্তমানে মাদারীপুরের অনেক মেয়ে জাতীয় দলেণ অংশগ্রহণ করে আসছে এবং ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে ঢাকা প্রথম বিভাগ হ্যান্ডবলে মাদারীপুর ট্রেনিং সেন্টার অংশগ্রহণ করছে।
মাদারীপুরে ভলিবল খেলা অনুষ্ঠিত হতো। সুরুজ, নুরুল আমিন এরা ভালো ভলিবল খেলতো। সুরুজ একজন ক্রীড়া আন্তঃপ্রাণ। এক সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা মাদারীপুরে এসে এ ভলিবল খেলায় অংশগ্রহণ করত। আমাদের সময় ক্রিকেটে মাদারীপু জেলা দল কয়েকবার আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ হয়েছে। ক্রিকেট এক সময় লুৎফর হাওলাদার, ফজলুল হক, মাসুদ, স্পপন সেন, হাবিবুল হক, খুকু, চুন্নু, টি.এম. শহীদুল্লাহ রাজ, ডা. অনলেন্দু , আমির বাবু ভাল ক্রিকেট খেলতেন। সে ঢাকা কয়েকটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারনে এই উদীয়মান খেলোয়াড় নি¯েপ্রাভ হয়ে যান। আমরা তার সু-চিকিৎসার জন্য সহায়তা প্রদান করি। আমাদের কয়েকজন খেলোয়াড় ওই সময় জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। গথিয়া কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের যে দলটি অংশগ্রহণ করেছিল, সে দলে মাদারীপুরের ৫ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে ছিল। সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমাদের ঐতিহ্য ছিল। জাতীয় বয়স ভিত্তিক সাঁতারে মাদারীপুর ৭টি স্বর্ণপদক পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গেšরব অর্জন করে। এই গৌরব অর্জনের পিছনে মোখলেস-এর অবদান অনস্বীকার্য। এখনো সাঁতারুদের নিয়ে মোখলেসের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আতিয়ার খান এ্যাথলেটিকসে বিশ্ববিদ্যালয় ব্লুজ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। মাদারীপুর মাস্টার কলোনির সান্টু এর মেয়ে বৈশাখী জাতীয় টেনিসে ৭ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাদারীপুরের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
খেলাধুলা নিয়ে অনেক কথা বললাম, মূলতঃ অনেক পাঁচালী হলো। অনেকদিন এ অঙ্গনে বিচরণ করলাম। আমরণ করতে চাই। অনেক কথা হয়তো বাদ পড়ে গেছে। তবে বর্তমান অবস্থায় ক্রীড়াঙ্গন ভালই চলছে। ক্রীড়াঙ্গনের ব্যবস্থাপনায় আরো কিছু ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব সম্পৃক্ত হলে ভালো হতো। আগামীতে সকলে মিলে ক্রীড়াঙ্গন সমৃদ্ধ করব এ প্রত্যাশা রইল।
(মাদারীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি হিসেবে ২০১১ইং সালে স্মরণিকায় প্রকাশিত লেখা।)

QR Code - Take this post Mobile!
Use this unique QR (Quick Response) code with your smart device. The code will save the url of this webpage to the device for mobile sharing and storage.

২ Responses to মুক্তিসেনা : আলমগীর হোসাইন

  1. osadharon post

    itsolutionbd.net
    ০৯-০৬-২০১৪ at ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
    Reply

  2. lovely news

    itsolutionbd.net
    ০৯-০৬-২০১৪ at ১:০০ পূর্বাহ্ণ
    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *